মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৫৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় আটটি দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানিতে অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৯.২৭ কোটি ডলার।
সম্প্রতি আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় সমুদ্রপথে রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইরানসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ওমানের মতো নিকটবর্তী দেশেও রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।
যদিও সীমিত পরিসরে বিমানপথে কিছু পণ্য পাঠানো হচ্ছে, তবে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশই সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। বিমানপথে রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ১৯ শতাংশ হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বড় ধরনের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারছে না।
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঞ্চলে তৈরি পোশাক ছাড়াও প্রায় ৪৯৩ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে পাটজাত পণ্য, মসলা, বিস্কুট ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, সবজি, পানপাতা, তামাক ও জুতা উল্লেখযোগ্য। গত অর্থবছরে শুধু মসলা ও বিস্কুট খাতেই প্রায় ১০ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেক প্রতিষ্ঠান অস্থায়ী কর্মীদের ছুটিতে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। আগে যেখানে সমুদ্রপথে একটি কনটেইনার পাঠাতে প্রায় ২ হাজার ২০০ ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিমানপথেও প্রতি কেজিতে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য এই সংকট আরও বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার বাজার থেকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করেছিল, তারা নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা করছে, তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকায় সেটিও সহজ হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিকল্প বাণিজ্যিক পথ খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।



