দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা খাতের প্রতি দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা বর্তমানে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে এবং এই বৈষম্য অব্যাহত থাকলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হবে।
সোমবার (৪ মে) দেওয়া ওই বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষিতের হার অত্যন্ত কম, যা উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এখনও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে, ফলে শিক্ষার মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান নির্ভর করে শিক্ষকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ওপর। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত।
আরও পড়ুনঃ- নেত্রকোনায় মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, শিশু ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অভিযোগ করেন, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য তেমন অবকাঠামো নেই। ফলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদেরও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি প্রতিটি জেলায় পৃথকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান।
একই সঙ্গে অস্থায়ী সমাধান হিসেবে বিদ্যমান পিটিআই (Primary Teachers Training Institute) গুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি। এতে স্বল্প সময়ে বড় সংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এখনও অনেক মৌলিক সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে মিড-ডে মিল, উপবৃত্তি, পোশাক, জুতা ও শিক্ষা উপকরণসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরাও সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকার শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সেগুলোর বেশিরভাগই সাধারণ শিক্ষার দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত। মাদ্রাসা শিক্ষা সেখানে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এতে করে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব আরও বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। শিক্ষা ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরও সমান অধিকার রয়েছে, তারা যেন অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো সব সুযোগ-সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারকে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এতে করে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে একটি টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নিতে হবে।
তারা আরও বলেন, বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান নেই। একটি বা সীমিত সংখ্যক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে দক্ষ করে তোলা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।
এদিকে অভিভাবকরাও বলছেন, যদি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে তারা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে আরও আগ্রহী হবেন। এতে করে শিক্ষা ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষা খাতে বৈষম্য দূর করতে হলে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা—সবগুলোকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।






4 thoughts on “মাদ্রাসা শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি ইসলামী আন্দোলনের”