দেশজুড়ে মহিলা মাদরাসাগুলোর শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে তরুণ আলেমদের প্ল্যাটফর্ম ‘সাধারণ আলেম সমাজ’। সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবনা সামনে এসেছে, যা ইতোমধ্যেই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
রোববার (৩ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মহিলা মাদরাসাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গুটিকয়েক ব্যক্তির অনৈতিকতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই পবিত্র শিক্ষাঙ্গন কলঙ্কিত হতে পারে না। তাই অবিলম্বে কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে যত্রতত্র অননুমোদিত মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই নেই পর্যাপ্ত তদারকি, নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক কাঠামো। ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ- মাদ্রাসা শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি ইসলামী আন্দোলনের
এ প্রেক্ষাপটে সাধারণ আলেম সমাজ ১০ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে—
১. অনুমোদন ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক:
যত্রতত্র অননুমোদিত মাদরাসা বন্ধ করে স্বীকৃত বোর্ড থেকে প্রাক-অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় তদারকি চালু করতে হবে।
২. শক্তিশালী পরিচালনা কমিটি গঠন:
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আলেম, শিক্ষিত ব্যক্তি ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে।
৩. আবাসিক ব্যবস্থার কঠোর নীতিমালা:
সংকীর্ণ ও অনিরাপদ স্থানে আবাসিক মাদরাসা পরিচালনা বন্ধ করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বোর্ডভিত্তিক তদারকি ও অভিযোগ সেল:
মহিলা মাদরাসার জন্য পৃথক অনুবিভাগ ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদ হটলাইন চালু করতে হবে।
৫. শিক্ষক নিবন্ধন ও ব্ল্যাকলিস্ট পদ্ধতি:
শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় নিবন্ধন চালু করে অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. পরিচালকের দায়বদ্ধতা ও কঠোর শাস্তি:
অপরাধে জড়িত বা প্রশ্রয়দাতা পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. সিলেবাসে ব্যবহারিক শিক্ষার সংযোজন:
দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, আত্মরক্ষা ও হস্তশিল্পের মতো ব্যবহারিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৮. জবাবদিহিতা ও অডিট ব্যবস্থা:
প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের নিয়মিত অডিট এবং প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করতে হবে।
৯. অভিভাবকদের সচেতনতা:
অভিভাবকদের নিয়মিত সন্তানদের খোঁজখবর নেওয়া ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণে সক্রিয় হতে হবে।
১০. আলেম সমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান:
অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই মুখ্য—এই নীতিতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
সংগঠনটি বলছে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে মহিলা মাদরাসাগুলোর পরিবেশ আরও নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী মাদরাসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তাই এই খাতকে অবহেলা করলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে। বিশেষ করে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও কার্যকর তদারকির অভাব দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদিকে অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর পর আর খোঁজখবর নেন না, যা নানা সমস্যার জন্ম দেয়। নিয়মিত যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই ১০ দফা প্রস্তাব সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে মাদরাসা শিক্ষায় শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরে আসবে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।







