দেশের মাদরাসা শিক্ষায় গত এক দশকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তের হার নেমে এসেছে মাত্র ৯ দশমিক ১৯ শতাংশে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে মাদরাসা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এ হার ১৯ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও ২০২১ সালে তা ২৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৯ শতাংশে—যা বিশেষজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আরও পড়ুনঃ- ২০২৬ সালের আলিম পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রুটিন প্রকাশ, ২ জুলাই থেকে শুরু
নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রশিক্ষিত নারী শিক্ষকের হার ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, সেখানে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণের ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে।
এদিকে মাদরাসা শিক্ষকের মোট সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১২ সালে যেখানে শিক্ষক সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৭২৮ জন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২ জনে। অর্থাৎ ১৩ বছরে প্রায় ২১ হাজার নতুন শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন। তবে এই নতুন শিক্ষকদের অধিকাংশই এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে থাকায় সামগ্রিকভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের প্রধান কারণ হলো প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতি। বর্তমানে দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য কার্যত একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে—গাজীপুরের বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএমটিটিআই)। এই একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চিত্রও উদ্বেগজনক। এখানে প্রায় ৪ হাজার ৪৩৫ জন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, অথচ প্রশিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৭ জন। ফলে শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থীর অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:২৬১, যা কার্যকর প্রশিক্ষণের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, “দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই সীমিত। নতুন নিয়োগ বাড়লেও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না বাড়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় যেখানে প্রতিটি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে মাদরাসা শিক্ষায় সেই সুবিধা নেই।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, “মাদরাসা শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। শিক্ষার মান উন্নয়নে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকাও একটি বড় সমস্যা। যদি উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে সমন্বিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তাহলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে ব্যয় কমবে এবং দক্ষতাও বাড়বে।
বর্তমানে দেশে দাখিল থেকে কামিল স্তর পর্যন্ত মোট মাদরাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৬৯টি, যার মধ্যে ৯ হাজার ২৬৬টি বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এমপিওভুক্ত এবং সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় রয়েছে। এই খাতে প্রায় ২৮ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা দেশের মোট শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ।
মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি সাময়িক এবং ধীরে ধীরে উন্নতি হবে। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) মো. আবুল কালাম তালুকদার জানান, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে সময় লাগে। এছাড়া অনেক অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিত শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় সাময়িকভাবে এই হার কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন কোর্স চালুর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাদরাসা শিক্ষার মান আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪, সংশ্লিষ্ট সূত্র






