নারী প্রভাষককে জুতাপেটা, শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ—নির্বিকার শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন

রাজশাহীতে নারী প্রভাষককে জুতাপেটা, প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

রাজশাহীর দুর্গাপুরে একটি সরকারি কলেজে নারী প্রভাষকসহ একাধিক শিক্ষককে জুতাপেটা ও মারধরের ঘটনায় সারাদেশে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি ঘটার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।

বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল ২০২৬) দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষার কারণে কলেজ ও আশেপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশও মোতায়েন ছিল।

পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে হামলা

প্রত্যক্ষদর্শী ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী ১৪৪ ধারা অমান্য করে কলেজে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে নানা বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

হামলাকারীরা শুধু মারধর করেই থেমে থাকেনি, কলেজের অফিসকক্ষেও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ অন্তত পাঁচজন শিক্ষক-কর্মচারী গুরুতর আহত হন।

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অধ্যক্ষ ও নারী প্রভাষকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলার অভিযোগ

ঘটনার সময় কলেজ প্রাঙ্গণে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ছিলেন বলে জানা গেছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে তাণ্ডব চালিয়েছে। এতে শিক্ষকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

তবে পুলিশের দাবি, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। পুলিশ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছু লোক হঠাৎ করে হামলা চালায়, যা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।”

শিক্ষকদের অভিযোগ: চাঁদাবাজির চাপ

আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কলেজ প্রশাসনের ওপর চাঁদা দেওয়ার চাপ ছিল। অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল।

তিনি বলেন, “আমি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো অবৈধ দাবিতে সাড়া দিইনি। এর জের ধরেই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আমার ধারণা।”

নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা বলেন, “আমি একজন সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষের পাশে দাঁড়িয়েছি। সেটাই আমার অপরাধ হয়ে গেছে। স্থানীয় হয়েও আমাকে ছাড় দেওয়া হয়নি।”

পাল্টা অভিযোগ রাজনৈতিক নেতাদের

অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কলেজে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছিল। তারা সেই হিসাব জানতে চেয়েছিলেন।

তাদের দাবি, ঘটনাদিনে প্রথমে শিক্ষকদের পক্ষ থেকেই হামলা করা হয়, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

শিক্ষা প্রশাসনের নীরবতা

ঘটনার পরপরই শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা পরিচালক ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

শিক্ষকদের অভিযোগ, কলেজ পরিচালক বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় রাজনৈতিক চাপে তিনি নীরব রয়েছেন। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সারাদেশে ক্ষোভ

এই ঘটনার পর সারাদেশে শিক্ষক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের হামলা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

আরও পড়ুন:- ডাকসু নেতাদের ওপর হামলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া, যা বললেন ফাতিমা তাসনিম জুমা

পরীক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক

ঘটনার সময় পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরীক্ষার্থী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক নিরাপত্তার অভাবে কেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল সময়ে এমন ঘটনা ঘটানো শুধু আইন ভঙ্গই নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

সচেতন মহল মনে করছে, এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন:- সরকারি দায়িত্ব শেষে আবারও শিক্ষকতায় ফিরলেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

তারা বলছেন, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও সক্রিয় হতে হবে।

🧾 তথ্যসূত্র: দৈনিক শিক্ষাডটকম ও সংশ্লিষ্ট সূত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

Bangla Daily News-এর নিজস্ব প্রতিবেদকরা দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নির্ভুলভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকেন। সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে তারা সর্বদা সচেষ্ট।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment