ফেনীর পরশুরামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা এক মসজিদের ইমাম অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক পিতা তার আপন বড় ভাই। পুলিশ জানিয়েছে, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
জানা গেছে, পরশুরাম উপজেলার এক কিশোরী ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। কয়েক বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান জন্ম দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর মা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়ুনঃ- আলিয়া মাদরাসায় চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন কওমি সনদধারীরা
পরে ২৬ নভেম্বর অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান।
তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ইমাম ও কিশোরীর সংরক্ষিত নমুনা ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, পরীক্ষায় কোনো পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে অভিযুক্ত ইমামের ডিএনএর সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে পুলিশ কিশোরী ও তার সন্তানকে নিয়ে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে। তদন্ত চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী একপর্যায়ে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে তাকে নির্যাতন করছিল। বিষয়টি গোপন রাখতেই পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় ইমামকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করেন।
এরপর ২০২৫ সালের ১৯ মে কিশোরীর বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তিনি নিজের বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার শিশু কন্যা এবং অভিযুক্ত ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
৯ আগস্ট প্রকাশিত ফরেনসিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কারাভোগ করা ইমাম মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনা ধর্ষণের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “ডিএনএ পরীক্ষায় প্রকৃত সত্য সামনে এসেছে। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ইমাম মোজাফফরের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, মিথ্যা অভিযোগে একজন নির্দোষ ব্যক্তির কারাভোগের ঘটনা বিচার ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। একইসঙ্গে শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় সঠিক তদন্তের গুরুত্ব আরও একবার সামনে এলো।
তথ্যসূত্র: নিজস্ব প্রতিবেদক








