বেহাল শিক্ষা, অন্যদিকে নজর মন্ত্রণালয়ের—সংকটে মান ও ব্যবস্থাপনা

বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা, মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশে

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে সংকটের কথা বলা হচ্ছিল, তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মহামারি করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পরও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফেরানো যায়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে শিক্ষা খাত যেন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে শেখানোর চেয়ে পরীক্ষা আয়োজনেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন। ফলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও জ্ঞানার্জনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না।

গবেষণা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনেও এই চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণির ৭৬ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে না। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এইচএসসি পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর জ্ঞান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের হুমকি। তারা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরনো কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছে। ২০১২ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী অনেক জায়গায় পাঠদান চলছে, যা বর্তমান সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এদিকে শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কম বেতন এবং পেশাগত মর্যাদার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষক তাদের পুরো কর্মজীবনে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন;- এসএসসির প্রথম দিনেই বহিষ্কার ৬ পরীক্ষার্থী ও ১ পরিদর্শক

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের ওপর, সেই সহকারী শিক্ষকরা এখনো নিম্ন গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা ১১তম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার দাবি জানালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে তাদের পদোন্নতি কার্যত বন্ধ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা খাতেও চিত্র ভিন্ন নয়। দেশে পাবলিক ও প্রাইভেট মিলিয়ে ১৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরির বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে প্রায় ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত।

কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব থাকলেও বাস্তবে এ খাত বরাবরই অবহেলিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি ছিল, যা এখনো যথেষ্টভাবে করা হয়নি।

শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভরতা। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের শেখার চেয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এতে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, “শিক্ষায় সমস্যাগুলো নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সংখ্যাগত উন্নয়ন হলেও মানের উন্নয়ন হয়নি। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে টাস্কফোর্স গঠন করে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।”

এদিকে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষানির্ভর না হয়ে শিখননির্ভর হওয়া উচিত। ক্লাসরুমে শেখানোর ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।”

সম্প্রতি অনলাইন ও সশরীর ক্লাস মিলিয়ে হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক বলছেন, একাধিক সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত ডিজিটাল ডিভাইস না থাকায় শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ছে।

এছাড়া এমপিওভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও অগ্রগতি থেমে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রস্তাব পাঠানো হলেও বর্তমান সরকারের সময়ে তা এগোয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়নে এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক কারিকুলাম। অন্যথায় শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

Bangla Daily News-এর নিজস্ব প্রতিবেদকরা দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নির্ভুলভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকেন। সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে তারা সর্বদা সচেষ্ট।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Comment