দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শেষে আবারও প্রিয় পেশা শিক্ষকতায় ফিরে গেছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া (জিরি মাদ্রাসা)-তে নিয়মিত পাঠদান শুরু করেছেন।
সম্প্রতি তার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসার খবর প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পর পুনরায় শিক্ষার্থীদের মাঝে ফিরে আসাকে অনেকেই ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
আবারও শ্রেণিকক্ষে খালিদ হোসেন
জানা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুই দিন জিরি মাদ্রাসায় ক্লাস নিচ্ছেন ড. খালিদ হোসেন। তিনি দাওরায়ে হাদিস বিভাগের শিক্ষার্থীদের ‘তিরমিজি শরীফ’ এবং দারুল উলুম দেওবন্দ সংশ্লিষ্ট পাঠদান করছেন। গত ২৩ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) সকাল ১১টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা তিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন।
প্রিয় শিক্ষককে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, তার ক্লাস শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনাও তিনি তুলে ধরেন, যা তাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম (মহাপরিচালক) মাওলানা খুবাইব বিন তৈয়ব বলেন,
“ড. খালিদ হোসেন ২০২১ সাল থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে মুহাদ্দিস হিসেবে শিক্ষকতা করছেন। উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ের কারণে তিনি নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেননি। এখন আবার তাকে ফিরে পাওয়াটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, একজন জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব হয়েও শিক্ষকতার প্রতি তার এই আন্তরিকতা শিক্ষকদের জন্য অনুকরণীয়।
‘শিক্ষকতাই আমার মূল পরিচয়’
নিজের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন,
“শিক্ষকতাই আমার আসল পরিচয়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আবার শিক্ষার্থীদের মাঝে থাকতে পারাটা আমার জন্য আনন্দের। আমি বাকি সময়টা শিক্ষার সঙ্গেই কাটাতে চাই।”
আরও পড়ুনঃ- সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থিতা বাতিল, শূন্য আসন নিয়ে তৈরি নতুন জটিলতা
তিনি জানান, অতীতে তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন এবং দীর্ঘদিন মসজিদের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে অন্যান্য কিছু দায়িত্ব থেকে সরে এসে তিনি শিক্ষাদানে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
জিরি মাদ্রাসার পরিবেশ নিয়ে মন্তব্য
জিরি মাদ্রাসা সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই এবং শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব।
তার মতে, একটি সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে এমন সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপদেষ্টা থাকাকালীন অবদান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. খালিদ হোসেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য আলোচনায় আসেন। বিশেষ করে হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং হাজিদের উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রশংসা পায়।
তিনি বলেন,
“হজ ব্যবস্থাপনায় কোনো সিন্ডিকেটকে প্রভাব বিস্তার করতে দিইনি। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করেছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল—কোনো হাজী যেন হজে যেতে ব্যর্থ না হন।”
আরও পড়ুন:- শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট কাটাতে বড় উদ্যোগ, বছরে ২০০ কোটি বরাদ্দের চিন্তা
শিক্ষার্থীদের অনুভূতি
মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান,
“হুজুরের ক্লাস আমরা খুব উপভোগ করি। তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, জীবনের বাস্তব দিকগুলোও আমাদের সামনে তুলে ধরেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসা আমাদের জন্য গর্বের।”
তাদের মতে, একজন জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাদের জন্য বিশেষ সম্মানের।
বহুমুখী অভিজ্ঞতার অধিকারী
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা, গবেষণা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রজীবনে তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে একজন খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তার রচিত বহু গ্রন্থ দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও মধ্যপন্থী চিন্তার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
আরও পড়ুন:-দল বড় করতে মাঠে এনসিপি, বিভিন্ন দল থেকে নেতাকর্মী ভেড়ানোর চেষ্টা জোরদার
অনুপ্রেরণার নতুন দৃষ্টান্ত
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষে আবার শিক্ষকতায় ফিরে আসা অনেকের কাছে একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি প্রমাণ করে যে জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদানই একজন প্রকৃত শিক্ষকের মূল পরিচয়।
ড. খালিদ হোসেনের এই প্রত্যাবর্তন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে—যেখানে ক্ষমতা বা পদ নয়, বরং জ্ঞান ও শিক্ষাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
🧾 তথ্যসূত্র:বাংলাদেশ প্রতিদিন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র







